শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৪:০০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
তীর্থ পরিক্রমা ও দিনব্যাপী আড্ডায় সনাতনী এসএসসি ৯৯ মৌলভীবাজারে গীতা দান কর্মসূচি বোয়ালখালী শ্রীশ্রী বাবা লোকনাথ ব্রক্ষচারী নবনির্মিত শ্রী মন্দিরের ১২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উৎসব উপলক্ষে মহানামযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় মা কালীর ভক্তদের দীর্ঘ লাইন লামা কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেডের বিজয়ী সভাপতি বাসু দাশ,সেক্রেটারী বিপুল নাথ গুইমারাতে বার্ষিক গীতা ও নৈতিক শিক্ষা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত রাউজান কদলপুর স্কুল এন্ড কলেজে সনাতনী শিক্ষার্থীদের “শ্রীমদ্ভগবদগীতা যথাযথ” দান চকরিয়া সরকারি কলেজে ৫৬ বছর পর প্রথম বাণী অর্চ্চনা পরিষদ গঠন ও সরস্বতী পুজোর প্রস্তুতি চলছে মৌলভীবাজার জেলা সনাতনী বৈদিক বিদ্যালয়ের অনুমোদন কুড়িগ্রাম ফুলবাড়িতে অসহায় সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ

জনপদের নীরব ইতিহাস, ৩২০ বছরের চাপালিশ!

Spread the love

অজয় মিত্র : নিজস্ব প্রতিনিধি 

ঠাঁয় দাড়িয়ে থাকা চাপালিশ, বয়স ৩২০ বছর! যেন এই জনপদের নীরব ইতিহাস।

পাহাড় ঘেরা শহর রাঙামাটির জিরো পয়েন্ট, জেলা প্রশাসকের বাংলোর প্রবেশ গেইটের পাশেই দেখা মিলবে সুবিশাল এই চাপালিশ গাছের। গাছটির গায়ে লাগানো বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বয়স ৩১৯ বছর। দৈর্ঘ্য ১০৩ ফুট, পরিধি ২৫ ফুট।

স্থানীয় ও ভ্রমণপিপাসু প্রতিটা পর্যটকের দৃষ্টি নিবন্ধ হয় গাছটির বয়স দেখে। এ যেন কাপ্তাই বাধেঁর ফলে সৃষ্ট বিশাল হ্রদের নিচে ডুবে থাকা পুরাতন রাঙামাটির নির্বাক স্বাক্ষী। অনেক পরিবর্তন, পরিবর্ধনের পরও ঠাঁয় এখানে দাড়িয়ে থাকা।

এই চাপালিশ গাছ নিয়ে অতীতে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, প্রকাশনায় লেখালেখিও হয়েছিল অনেক। যেটাতে মানুষের সবচেয়ে বেশী কৌতুহল, এর বয়স এবং সে বিবেচনায় অনেক প্রাচীন একটা গাছ। এই প্রসঙ্গে সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান একবার বলেছিলেন, “এ বিষয়ে আমার কাছে আসলে তেমন কোন তথ্য নেই, জানতে হবে। তবে বোটানিষ্ট বা হর্টিকাল্চারিষ্টরাই ভাল বলতে পারবে, কারণ বয়স বের করার একটা সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা আছে”।

চাপালিশ মূলত মোরাসি পরিবারের কাঁঠাল জাতীয় একটি বন্য প্রজাতির ফল। বৈজ্ঞানিক নাম: Artocarpus chama; আর্টোকার্পাস চামা। একে চামল, চাম্বল, চাম্বুল বা চাম কাঁঠালও বলা হয়ে থাকে। প্রায় কাঁঠালের মতো দেখতে তুলনামূলক ছোট আকৃতির এই ফলটিকে মানুষেরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলেও বন্যপ্রাণীর খাদ্য হিসেবেই এটি প্রসিদ্ধ।

চাপালিশ গাছ কুমিল্লার লালমাই পাহাড়, কক্সবাজার, সিলেট, পাবর্ত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী অঞ্চলে বেশী জন্মালেও ময়মনসিংহ, গাজীপুর এবং ঢাকা মিরপুরের জাতীয় উদ্যানেও দেখতে পাওয়া যায়।

ডিসি বাংলো পার্ক সংলগ্ন চায়ের দোকানে বসা স্থানীয় বাসিন্দা ইদ্রিস মিয়া বলেন, আমার বয়স এখন ৫২, অনেক বছর ধরে এই এলাকায় বসবাস, বাপ-দাদার মুখেও শুনেছি এই গাছের কথা, অনেক বছরের পুরানো এটি।

 

পার্বত্য অঞ্চলের বহু বিবর্তনের স্বাক্ষী এই চাপালিশ গাছ। বৃটিশ, পাকিস্খান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, অনেক কিছুর পট পরিবর্তন, গোড়াপত্তনও এই স্থান থেকে। কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ পরবর্তী জন জীবন ও জীব বৈচিত্রের ব্যাপক পরিবর্তন, সবকিছুর মাঝেও টিকে আছে গাছটি।

নিকটবর্তী ঐতিহ্যবাহী স্কুল রাঙামাটি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, সাংবাদিক ও সংগঠক সৈকত রঞ্জন চৌধুরীর স্মৃতিতেও এই চাপালিশ গাছ। তিনি বলেন, “আমরা স্কুলে প্রাতঃ বিভাগে ছিলাম, স্কুল ছুটির পর অনেক সময় কেটেছে এই এলাকায়, হেসেই বলছিলেন.. প্রেমের কোন স্মৃতি না থাকলেও, এই চাপালিশ গাছের নিচে কত আড্ডা ছিল আমাদের বন্ধুদের। সর্বপরি শহরের অনন্য এক স্মারক এই চাপালিশ গাছ”।

হ্রদ বেষ্টিত শহরের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থানও এটি। হ্রদের বিশাল একটা অংশের দৃশ্য উপভোগ করা যায় এই স্থান থেকেই। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থীর ভিড় জমে এখানে। পুরানো এই চাপালিশ গাছ, তার চারপাশের ছায়া সুশীতল পরিবেশ আকৃষ্ট করে সব বয়সী মানুষকেই।

অজিত কুমার রুদ্র বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (দক্ষিণ) হিসেবে কর্মরত ছিলেন রাঙ্গামাটিতে। একদিন এক চায়ের আড্ডায় গাছের বয়স গণনা বিষয়ে তিনি বলেন, “গাছের বয়স গণনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটা হলো, ঋতুচক্র হিসেবে গাছ সব ঋতুতে বাড়ে না। সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতুতে গাছের বৃদ্ধি ঘটে বেশী। শীতকালে গাছ বাড়ে না। গাছ না বাড়ার কারণে প্রতি বছর সে সময় গাছের চারপাশে একটা রিংয়ের মত তৈরী হয়। যন্ত্রের সাহায্যে সেই রিং গুলো গণনা করে গাছের বয়স বের করা হয়”।

তিনি আরো বলেন, “বৈজ্ঞানিক গণনা ছাড়াও স্খানীয় ভাবেও গাছের বয়স গণনা করা হয়। গাছ লাগানো থেকে হিসেব করে বছর গুণে অথবা জনশ্রুতি থেকেও অনুমান ভিত্তিক গাছের বয়স গণনা করা হয়”।

৩১৯ বছরের চাপালিশ গাছ সম্পর্কে অজিত কুমার রুদ্র বলেন, “এখানে বয়সের বিষয়টি অনেক বছর ধরে চলে এসেছে। চলমান একটা জনশ্রুতির বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার থাকে না। যে সময় থেকে গাছটির বয়সের বিষয়টি প্রকাশিত, সে সময় নিশ্চয় এই দুই পদ্ধতির কোন একটি দ্বারা চাপালিশ গাছের বয়স নির্ণীত হয়েছিল এর আকার আয়তন, পরিধি সহ। এক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, ভূমিধ্বস এসবের কারণে”।

এই ধরণের গাছকে সাধারণত আমরা সেঞ্চুরিয়ান ট্রী বলি- বলছিলেন অজিত কুমার রুদ্র।

এই চাপালিশ গাছ প্রসঙ্গে ভিন্ন মত চট্টগ্রাম কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক সমীর কান্তি নাথের।

তিনি বলেন, “প্রথম কথা হচ্ছে গাছের বয়স শতভাগ সুনির্দিষ্টকরণ করা যায় না, যদি গাছ জীবিত থাকে। একাধিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে, যেগুলো ব্যবহার করে আনুমানিক বয়স নির্ধারণ করা যায়।

তবে গাছ কেটে ফেলার পর গাছের গায়ের বর্ষ-বলয়ের সংখ্যা, এর সাথে পরিধির মাপের একটা হিসাব নিকাশ করে বয়স নির্ধারণের যে পদ্ধতি সেটাকে আমরা মোটামুটি নির্ভরযোগ্য বলি”।

সমীর কান্তি নাথ আরও বলেন, “জীবিত গাছে এই বর্ষ বলয়ের সংখ্যা দেখা যায় না, এজন্য আমরা একটা মোটামুটি মাপ ধরে নিই, যেটা নির্ভরযোগ্য নয় কারণ মাটির গুনাগুনের তারতম্যের কারণে growth rate of tree ভিন্ন হতে পারে।

তারপরও যদি গড় পড়তা হিসাব করি, গাছের গায়ে লাগানো তথ্য যদি ঠিক থাকে অন্ততঃ পরিধি যদি ২৫ ফিট ঠিক থাকে এবং এই মাপটা যদি মাটি থেকে সাড়ে চার ফিট উপর থেকে নেয়া হয় তাহলে এই গাছের বয়স আনুমানিক ২৩০ থেকে ২৫০ বছর হবে”।

গাছটির বেড়ে উঠা, ডালপালা অনেক ছড়ানো। গাছের গোড়ার মাটি যাতে সড়ে না যায়, সেজন্য পাকা দেওয়ালের বেষ্টনী দেওয়া হলেও শেকড় বেশ বিস্তৃত। পরগাছা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মাটি ক্ষয়, জন সাধারণের অসচেতনতায় গাছটি সময়ে সময়ে ক্ষতিগ্রস্থ হলেও কালের স্বাক্ষী হয়ে প্রাঞ্জল ভাবে ছায়া বিলিয়ে বেড়ায় এখনো।

“এই গাছটি এই শহরের ইতিহাসেরই অংশ, একে সংরক্ষণ করতে হবে শহরের প্রয়োজনেই। কোন কারণেই যেন গাছটি ক্ষতিগ্রস্থ না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে”-বলেই মত দিলেন পরিবেশ-জীববৈচিত্র বিষয়ক গবেষণাধর্মী লেখক ও সাংবাদিক প্রান্ত রনি।



আমাদের ফেসবুক পেইজ