বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২০, ০৪:৩৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বিশ্ব বিখ‍্যাত শিল্পপতি অম্বরিশ সুখশান্তির খোঁজে সনাতন ধর্মগ্রহন করে হয়ে উঠলেন কৃষ্ণ ভক্ত মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষার্থে নতুন সিটি করপোরেশন প্রশাসকের নিকট মন্দির কমিটির খোলা চিঠি শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী পরিষদ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন অনাথ আশ্রমে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ লাখাইয়ে স্বাস্থ্য বিধি মেনে দুই দিন ব্যাপী শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব উৎসব পলিত হচ্ছে বন্যার পরেও কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে দিগন্তজুড়ে সবুজের সমারোহ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মায়ের বাড়ি শ্রীশ্রী শচীঅঙ্গন ধামে ডাকাতি শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সুজিত কুমার দাশ শুভ জন্মাষ্টমী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন শিক্ষা উপ-মন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ যশোরের ভার্চুয়্যাল আয়োজন শুভ জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন শ্রীকৃষ্ণ দুষ্টকে দমন করে সৃষ্টকে পালন করেছিলো

পরমেশ্বর ভগবান শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা সম্প্রীতির এক অনন্য মিলন মেলা।

অভিজিৎ দে রিপন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা। শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে জানা যায় দ্বাপরযুগে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত, অবন্তীনগরীর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা স্বপ্নাদেশ পেয়ে শুরু করে ছিলেন। মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বর্গলোকের দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে দিয়ে পুরীর শ্রীমন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এই শ্রীমন্দির উদ্বোধন করেছিলেন সয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মা ।
 
এই পুরীধামে রত্ন সিংহাসনে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীজগন্নাথদেব,অগ্রজ ভ্রাতা বলদেব ও কণিষ্ঠা ভগ্নি সুভদ্রা মহারাণীকে নিয়ে বিরাজমান।পরমেশ্বর ভগবান শ্রীজগন্নাথদেবের কৃপা লাভে লক্ষ লক্ষ ভক্তবৃন্দ এই মন্দির পরিদর্শন করে থাকেন। উড়িষ্যার পুরীর জগন্নাথ ধামের রথযাত্রা জগদ্বিখ্যাত। পুরীকেই ‘শ্রীক্ষেত্র’ বা‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র’ও বলা হয়। আধুনিক যুগে এসেও পুরীধাম এই বৈদিক স্থাপত্য শ্রীমন্দিরটি বিশ্বজুড়ে এক বিস্ময়কর সৃষ্টিকর্ম হিসেবে বিবেচিত । কলিযুগের পাবনাবতারী শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু ৫০০ বছর পূর্বে পুরীতে পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসবকে এক মহিমান্বিত রূপ প্রদান করেছিলেন। তিনি আগত ভক্তবৃন্দদের সাথে হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে নৃত্য করতেন। তিনি নীলাচলে এলে জগন্নাথ মন্দিরে রথযাত্রার উৎসব বৃহত্তর আঙ্গিকে শুরু হয়। তাঁরই ভাবদ্বারায় শ্রীকৃষ্ণের একজন শুদ্ধ ভক্ত হিসেবে আর্ন্তজাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ ইসকন এর প্রতিষ্টাতা আচার্য শ্রীল প্রভুপাদ পৃথিবীর নগর-গ্রামে রথযাত্রা উৎসব পোঁছে দিয়েছেন।ভারত,বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান মালার মাধ্যমে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয় পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের রথযাত্রা।
 
রথযাত্রা মহোৎসব বিশ্বে পরিণত হয়েছে সর্ববৃহৎ উৎসবে । সনাতনী কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পুণর্জাগরণে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে ইস্কন সোসাইটি। রথযাত্রা মূল অনুষ্ঠানের পক্ষাধিককাল পূর্বের পূর্ণিমা তিথিতে উপাস্য দেবতা শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক সূচনা। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। সাতদিন পরই শুক্লপক্ষেরই দশমী তিথিতে ফিরতি রথ বা উল্টো রথ অনুষ্ঠিত হয়। এই দিন পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেব রত্নবেদী সিংহাসন ত্যাগ করে ভক্তদের দর্শন দানের জন্য বেরিয়ে আসেন রাজপথে। ভক্তগন মন্দিরে যায় ভগবানকে দর্শন এবং প্রার্থনা করার জন্য । পরমেশ্বর ভগবান শ্রীজগন্নাথদেব ভক্ত পরিবেষ্ঠিত হয়ে সুসজ্জিত রথে নিজেই বের আসেন ভক্তদের দর্শন দানের জন্য। এই জন্য জগন্নাথদেবের আরেক নাম পতিত পাবন। করুণাময় পতিত পাবন,পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসবে ভক্তগন অংশগ্রহণ করে মানবজীবন ধন্য করার জন্য ছুটে আসেন। শাস্ত্রে আছে ‘রথস্থ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে’। রথের ওপর অধিষ্টত খর্বাকৃতি বামন শ্রীশ্রী জগন্নাথকে দর্শন করলে তার পুনর্জন্ম হয় না।
 
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যান্য দেবদেবীর বিগ্রহ বা মূর্তি থেকে পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের পার্থক্য বিশাল। অন্যান্য দেবদেবীর বিগ্রহ বা মূর্তি সোনা, রুপা,তামা, এমন কি মাটি দিয়েও তৈরী হয়। পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের বিগ্রহ বা মূর্তি তৈরী হয় নিম কাঠ দিয়ে এবং আকৃতিও বিচিত্র। চৌকো মাথা, বড় বড় চোখ এবং অসম্পূর্ণ হাত। পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের রথটানা মহাপুণ্য কর্ম এ বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করে প্রেমোরথে প্রাণের ঠাকুরকে রথের রথরজু (দড়ি) ধরে টানতে ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে শিশু থেকে বৃদ্ধ বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর মানুষ অবস্থান নেন। ভক্তি সহকারে রথরজ্জুর(দড়ি) টেনে রথকে এগিয়ে নিয়ে যান ভক্তগন। সুসজ্জিত রথে থাকেন পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের-বলরাম-সুভদ্রা মহারানীর বিগ্রহ।ভক্তরা উলুধ্বনি ও মঙ্গলধ্বনির মাধ্যমে শঙ্খ, ঘণ্টা, ঢাক, ঢোল,কাঁসা, বাজিয়ে হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে নেচে-গেয়ে অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করে তোলেন। রাস্তার দুই পাশে দাড়িয়ে থাকা ভক্তগন উলুধ্বনি ও মঙ্গলধ্বনির মাধ্যমে সুসজ্জিত রথে থাকা পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের-বলরাম-সুভদ্রা মহারানীর বিগ্রহ দর্শন করে কৃতার্থ হন।
 
ভক্তদের উদ্দেশ্য রথ থেকে ছুড়ে দেয়া হয় কলা,ধানের খৈ ও বিভিন্ন ফল প্রসাদ ও আশীর্বাদ। কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর এভাবেই রথযাত্রার ব্যাখ্যা দিয়েছেন । রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম, ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম। পথ ভাবে আমি দেব রথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব—হাসে অন্তর্যামী। বাংলার ঐতিহ্যেও পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের রথযাত্রা প্রাচীন উৎসব ৷পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের বিগ্রহ দর্ণন করার জন্য নানা ধর্মের-বর্ণের লোক উদগ্রীব হয়ে সমবেত হয়। সমগ্র জগতে কল্যাণে পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেব মন্দিরের পূজাবেদী হতে বেরিয়ে এসে রথারোহণে যাত্রা শুরু করেন। বাংলাদেশে অন্যতম প্রাচীন উৎসব ধামরাইয়ের রথযাত্রা। প্রচলিত রয়েছে,৩০০ শত বছর পুর্বে তৎকালীন রাজা যশোপাল যশোমাধব বিগ্রহ স্থাপন ও শ্রী মন্দির নির্মান করে রথযাত্রার সূচনা করেন।
 
চট্টগ্রামের রথযাত্রাও অনেক প্রাচীন। পাহাড়-সমুদ্রে ঘেরা চট্টগ্রামেও উড়িষ্যার পুরীধামের ১৮শ’ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে শুরু হয় রথযাত্রা উৎসব। এই রথের উৎসবেকে কেন্দ্র করে একটি স্থানের নামকরণও হয়েছে ‘রথের পুকুর পাড়’ নামে। চট্টগ্রাম শহরের নন্দনকাননে পাহাড়ের পাদদেশে বর্তমানে পুকুর পাড় ভরাট হয়ে গেছে। গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন আর দোকান-পাট। তৎকালীন সময়ে রথের পুকুর পাড় এলাকায় তুলসীধামের রথযাত্রার দিন শহরের বিভিন্ন মঠ-মন্দিরের রথ ছাড়াও আশপাশের উপজেলা থেকে রথগুলো এসে জমা হতো। ভক্তরা রথের পুকুরে পূণ্যস্নান করতেন । বসতো রথযাত্রার বড় আকর্ষণ রথের মেলা।
 
তুলসীধামে শ্রীশ্রী মদনমোহন নরসিংহ গোপাল জীও’র মন্দিরে পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথ-বলরাম ও সুভদ্রা মহারাণী শ্রীবিগ্রহের নিত্য পূজা চলে। নগরের নন্দনকানন শ্রীশ্রী রাধামাধব মন্দির ও ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দির সহ উপজেলার বিভিন্ন মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। আবহমান কাল ধরে বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক ও শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থানের মাধ্যমে নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করে আসছে। রথযাত্রা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। ধর্ম,বর্ণ,গোত্র নির্বিশেষে পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসবে অংশগ্রহণ করে সম্প্রীতি শান্তি ও প্রীতিময় পারস্পরিক সর্ম্পক সৃষ্টি হয় মানুষের মাঝে।পরমেশ্বর ভগবান শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা সম্প্রীতির এক অনন্য মিলন মেলা।
এ পুণ্যময় রথযাত্রার মধ্য দিয়ে বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ ও সৌহার্দ্য সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সমাজে ও জাতীয় জীবনে সম্প্রীতির বন্ধন আরো দৃঢ় হোক এটাই প্রত্যাশা। পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেবের রথের চাকার পবিত্র ঘূর্ণনে অনাচার, অন্যায়,অশান্তি ও অন্ধকার দূর হয়ে পরম কৃপায় পূর্ণ হোক ধরিত্রী।
 
লেখকঃ নির্বাহী সম্পাদক। অনলাইন সনাতন টিভি।



আমাদের ফেসবুক পেইজ