রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪, ০৮:১৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
আল আইন মরুতীর্থ প্রবাসী গীতা সংঘ মন্দিরে সংবর্ধনা ক্লাইন্ট ফারিয়াকে মামলায় সাহায্য করে ব্লাকমেইলের শিকার আইনজীবী মৃন্ময় কুন্ডু তপু দুবাই জয় শ্রীকৃষ্ণ লোকনাথ সেবা সংঘের ৯ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন বই মানুষকে আলোকময় জগতে পৌঁছতে সহায়তা করে- অধ্যাপক ড. সুকান্ত ভট্টাচার্য সন্তদাস কাঠিয়াবাবা মহারাজজীর ১৬৫তম আর্বিভাব উৎসব ২০২৪ মৌলভীবাজারে হিন্দু নারী সেজে লোকনাথ সেবাশ্রমে চুরি, হাতেনাতে আটক ৩ ধামরাইয়ে জগন্নাথ মন্দিরের ১৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ১৩৪তম তিরোধান দিবস উদযাপন কুলাউড়া উপজেলায় একের পর এক গীতা স্কুল উদ্বোধন পঞ্চগড়ে একযোগে পাঁচ হাজার কণ্ঠে গীতাপাঠ ও পিতা-মাতার পূজা অনুষ্ঠিত ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দান বাক্স লুটের চেষ্টা

বাংলাদেশে ধর্মান্তরকরণে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর নতুন মিশন! বাড়ছে উদ্বেগ

Spread the love

 

সনাতন টিভি ডেক্স:

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ধর্মান্তরকরণের নতুন মিশনে নেমেছে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। দাওয়াতের নামে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ধর্মান্তরিত করতে রীতিমতো সংগঠনের কর্মীদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আইডি ও পেজ খুলে এ-সংক্রান্ত প্রচার চালানো হচ্ছে। নিজেদের কর্মীদের শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধর্মান্তরিত করার কলাকৌশলও। নওমুসলিমদের সুরক্ষার নামে এ ধরনের অপকর্মে যুক্ত হয়েছে একটি ব্যাংকসহ একাধিক সামাজিক সংস্থা।

২০০৮ সালের পর ধর্ম মন্ত্রণালয় সরাসরি নওমুসলিমদের পুনর্বাসনে অর্থায়ন বন্ধ করলেও ইসলামিক ফাউন্ডেশন তাদের জাকাত ফান্ডের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে। সারা দেশে বেশকিছু সামাজিক সংগঠন সংখ্যালঘুদের ধর্মান্তরিত করার লক্ষ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নামেমাত্র বরাদ্দ সংখ্যালঘুদের জীবনমান উন্নয়নে বৈষম্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলেও মনে করেন অনেকে। তাদের ধর্মান্তরিত করতে এর সুযোগ নিচ্ছে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীটি। এমন বাস্তবতায় শঙ্কিত সনাতনসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ।

মানবাধিকার, ধর্মীয় নেতাসহ দেশের বিশিষ্টজন বলছেন, প্রযুক্তির যুগে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ অনলাইনে যুক্ত। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ অনেক বেশি। এই সুযোগ কাজে লাগাতে একটি গোষ্ঠী ফেসবুক, ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করছে। আবার প্রকাশ্যে সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে ধর্মান্তরকরণে উৎসাহ জোগাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নির্বিকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অন্য ধর্মের মানুষদের নানাভাবে দুর্বল করা ও দেশত্যাগে বাধ্য করার দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তারা এমন অপকর্ম শুরু করেছে।

তারা বলছেন, ধর্মান্তরকরণের অশুভ পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আইনের চোখে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ফৌজদারি অপরাধ। ধর্ম ও সংবিধানও এটি সমর্থন করে না। তথ্যপ্রযুক্তি ও ধর্মীয় অবমাননা আইনে দ্রুত এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াসহ উগ্র ধর্মবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক জাগরণ তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন কালবেলাকে বলেন, যে কাউকে ইসলাম গ্রহণে দাওয়াত দেওয়া যেতে পারে। তবে জোর করে কাউকে ধর্মান্তরিত করা, এর জন্য পুরস্কার ঘোষণা বা প্রলোভন দেখানোর অধিকার কারও নেই। এটি ধর্মের দৃষ্টিতেও অপরাধ।

 

‘বাংলাদেশ জমিয়তে আহলে হাদিস’ সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ ফারুক ও সেক্রেটারি জেনারেল ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী স্বাক্ষরিত একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ঘুরপাক খাচ্ছে। এতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বিশেষ করে হিন্দুদের ধর্মান্তরকরণে তাদের দলের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ধার্য করা হয়েছে। সংগঠনের সব জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর পাঠানো হয়েছে এর কপি। অফিসের ঠিকানায় দেওয়া আছে রাজধানীর উত্তর যাত্রাবাড়ীর ৭৯/ক/৩ বাসা। সেখানে গিয়ে কথা হয় এক ব্যক্তির সঙ্গে। তবে তিনি দাবি করেছেন, বিশেষ এই বিজ্ঞপ্তি তাদের সংগঠনের নয়। কেউ এই সংগঠনের নামে ষড়যন্ত্রে নেমেছে।

‘মুফতি যুবায়ের আহমদের পরিচালনায় ‘ইসলামী দাওয়াহ ইনস্টিটিউট’ নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠান দাওয়াতের নামে এক বছরের কোর্স বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে বিভিন্ন কৌশলে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করছে। মান্ডা শেষ মাথা গার্মেন্টসের সামনে ঠিকানা উল্লেখ করে পৃথক এই বিজ্ঞপ্তিতে ‘অসুমলিমদের মাঝে দাওয়াহ প্রশিক্ষণ কোর্স’ চালুর কথা বলা হয়। কোর্সের বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ‘হিন্দু-খ্রিষ্টান-মুরতাদ ভাইদের দাওয়াত দেওয়ার পথ ও পদ্ধতি’, ‘হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ-কাদিয়ানি ও বাহায়ী ধর্ম সম্পর্কে সম্যক ধারণা’, ‘অমুসলিমদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর।’

ফেসবুকে আরবি ও বাংলায় লেখা আরেকটি স্ট্যাটাসে বলা হয়েছে, ‘আমাদের মুসলিম ভাইয়েরা মূর্তি পূজারিদের (হিন্দুদের) প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্মান্তরিত করছে, আর সেই সঙ্গে সাচ্চা মুসলিম জন্ম দিচ্ছে। সবচেয়ে এটাই ভালো লাগছে যে, আমাদের মুসলিম ভাইয়েরা এমনভাবে ব্রেইন ওয়াশ করছে, মেয়েরা (অন্য ধর্মের) ভাবছে তাদের সত্যিই ভালোবাসছে। তাদের এ ভাবনা আমাদের মিশন পরিপূর্ণ করে দিচ্ছে ।’

আরেকটি স্ট্যাটাসে লাভ জিহাদের কথিত মিশনের গ্রুপ লিডার হিসেবে মামুন নামে এক ব্যক্তির নাম রয়েছে। আরেকটি ফেসবুক গ্রুপের স্ট্যাটাসে কীভাবে হিন্দু নারীকে কথিত প্রেমের ফাঁদে ফেলা হবে, তার একটি নির্দেশনাও রয়েছে। এতে ফেসবুকে হিন্দু নাম দিয়ে ফেক আইডি খুলে সনাতন ধর্মের মেয়েদের মিথ্যা প্রেমের ফাঁদে ফেলে তার সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ধর্মান্তরিত করার কথা বলা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক কালবেলাকে বলেন, ‘এটি একেবারেই ফৌজদারি অপরাধ। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার শামিল। এক শ্রেণির মৌলবাদী মানসিকতার লোকজন এ ধরনের অপতৎপরতায় লিপ্ত। এদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন বিরুদ্ধ মন্তব্য করে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আব্দুল মতিন বলেন, ‘আইন এ ধরনের কাজ সমর্থন করে না। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

ধর্মান্ধরা নিজেদের ধর্মীয় রীতিনীতি সাধারণ হিন্দুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগ করে ধর্মীয় নেতারা বলেছেন, বিভিন্ন অত্যাচার ও নির্যাতনের মাধ্যমে সংখ্যালগুদের দেশছাড়া করা হচ্ছে। প্রশাসনের কেউ কেউ এসব ধর্মীয় অবমাননাকারীর বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে থাকেন বলেও অভিযোগ তাদের। ধর্মান্তরিত করার কাজে নিয়োজিত অপশক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সামাজিকভাবে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের সাইবার প্যাট্রলিং অব্যাহত আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ধর্মান্তরিত করার প্রচার এখনো আমাদের নজরে আসেনি। ধর্মান্তরিত করার অপচেষ্টা কেউ চালালে গোয়েন্দা পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।’

এদিকে একটি বেসরকারি ব্যাংক ২০১০ সাল থেকে প্রতিষ্ঠা করেছে ‘নওমুসলিম কেয়ার এইড’। নওমুসলিমদের আইনি সহায়তা, আর্থিক সহযোগিতা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। নওমুসলিমদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে তারা কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ৬৪ জেলায় স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত কালবেলাকে বলেন, হিন্দু নারীদের ধর্মান্তরিত করতে দেশজুড়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে। সব ষড়যন্ত্রের উৎস এক। একটি ব্যাংক নওমুসলিমদের জন্য জাকাত ফান্ড গঠন করেছে; হিন্দু মেয়েদের ধর্মান্তরিত করতে ইউটিউবে প্রচার চলছে; প্রেমের অভিনয় করে তাদের বাগিয়ে আনা হচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন সংগঠন কর্মীদের জন্য

টাকা-পয়সা (পুরস্কার) ঘোষণা করেছে, যা অতীতে দেখা যায়নি।’

হিন্দু মেয়েদের ধর্মান্তরিত করার চিন্তা এক শ্রেণির মৌলবাদী গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের প্রকল্প উল্লেখ করে প্রবীণ এ আইনজীবী বলেন, ‘এগুলো হলো ধর্মীয় বিদ্বেষের নিকৃষ্টতম উদাহরণ। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের অপকর্ম চললেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মামলা হচ্ছে না। এ কারণে সংখ্যালঘুদের মনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।’

মৌলবাদী মানসিকতা থেকে ধর্মান্তরকরণের চিন্তা চলছে মন্তব্য করে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি মনীন্দ্র কুমার নাথ কালবেলাকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সজাগ থাকা প্রয়োজন। অপশক্তির বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এমন অপকর্ম বাড়বে।’

শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সামাদ কালবেলাকে বলেন, ‘সংবিধান এ ধরনের কর্মকাণ্ড সমর্থন করে না।’ রাষ্ট্রীয়ভাবে এই অপকর্মে যুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থে ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রখ্যাত আলেম ও শোলাকিয়ার সাবেক ইমাম মাওলানা ফরীদ ঊদ্দীন মাসঊদ। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধ সমূলে নির্মূল করতে হবে।’

দাওয়াতের নামে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ধর্মান্তরকরণের সাম্প্রদায়িক তৎপরতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)। ইসকনের সাধারণ সম্পাদক চারু চন্দ্র দাস ব্রহ্মচারী কালবেলাকে বলেন, ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কিছু ধর্মীয় সংগঠন ধর্মীয় দাওয়াতের নামে, বিশেষ বিজ্ঞপ্তি প্রচারসহ বিভিন্ন কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।’ সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়নসহ এই উসকানিমূলক অপতৎপরতায় লিপ্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

বাজেটে অবহেলা, জাকাত ফান্ড থেকে নওমুলিমদের সহায়তা:

২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি-জামায়াত জোট। এরপর থেকে টানা পাঁচ বছর ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বাজেটে নওমুসলিমদের পুনর্বাসনের জন্য পৃথক বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ খাতে বিএনপি সরকারের আমলে প্রতি মাসে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। পাঁচ বছরে এক কোটি টাকা সরাসরি ব্যয় হয়েছে। ধর্মীয় নেতারা বলছেন, ধর্মান্তরকরণ প্রক্রিয়াকে ২০০১ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়, যার ধারাবাহিকতায় সামাজিকভাবে এর বিস্তৃতি ঘটেছে এখন। এর আগে ১৯৮২ সালে গঠন করা জাকাত ফান্ড বিভাগে নওমুসলিমদের জন্য আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি উল্লেখ আছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতার আসার পর থেকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নওমুসলিম পুনর্বাসন খাতের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। নওমুসলিম পুনর্বাসনের স্থলে দুস্থদের সাহায্যের কথা বলা আছে। তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের যাকাত ফান্ড বিভাগের ‘নওমুসলিম স্বাবলম্বীকরণ কার্যক্রম’ এখনো চলমান। প্রতি বছর এই ফান্ড থেকে দুস্থ নওমুসলিমদের আর্থিক সহযোগিতা ও পুনর্বাসন করা হয়।

এদিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বাজেটে ধর্মীয় বৈষম্যের কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে মনে করে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ। অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সংখ্যালঘুদের নানা প্রলোভনে ফেলে এক শ্রেণির মানুষ তাদের ধর্মান্তরিত করছে বলেও অভিযোগ করেছেন ধর্মীয় নেতারা। তারা বলছেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি বাজেট বরাদ্দে সীমাহীন অবজ্ঞা, অবহেলা ও বৈষম্যের এক সুস্পষ্ট প্রমাণ।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ‘ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পরিচালন ব্যয় বরাদ্দ এবং উন্নয়ন খাতে মোট বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন খাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ মাত্র ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। জনসংখ্যার আনুপাতিক হারের সঙ্গে যা একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন চলে প্রতি বছরের বাজেট বরাদ্দ থেকে। আর হিন্দু বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টগুলো চলে আমানতের সুদের টাকায়। হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের নামে মোট স্থায়ী আমানতের ১০০ কোটি টাকা থেকে প্রতি বছরে ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ থেকে ৫ কোটি থেকে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা সুদ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি পেয়ে থাকে।

২০২১-২২ অর্থবছরে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মোট পরিচালন ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২৭৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ৬ কোটি ২ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ২ দশমিক ২৫ শতাংশ।

জানতে চাইলে পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সবার আগে রাষ্ট্রের জেনারেল ইনভেস্টমেন্ট বাড়ানো জরুরি, যাতে সবাই এর সুবিধা পায়। এর মধ্য দিয়ে মানুষের সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি বলেন, উন্নয়ন করতে হলে সবার জন্য হওয়া উচিত। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বাজেটে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয় বলেও মত বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদের।

প্রতি বছর ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘুদের জন্য নামমাত্র বরাদ্দকৃত অর্থবৈষম্য কি না, জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী কালবেলাকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে হবে। ভেবেচিন্তে পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে কথা বলব। তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ আহমাদ বলেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জনশক্তি, ধর্মীয় উপাসনালয় তুলনামূলকভাবে কম। ধর্ম মন্ত্রণালয় এই হিসাবে বিবেচনা করলে এটাকে বৈষম্য বলা যায় না। সংখ্যাটা ৫০-৫০ হলে বরাদ্দটাও সেভাবে দাবি করা যেত।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ধর্মীয় মন্ত্রণালয়ের কম বরাদ্দের কারণে সংখ্যালঘুরা ধর্মান্তরিত হচ্ছে, এমনটা আমরা মনে করি না। এমনটা আমাদের নজরেও আসেনি। সাধারণত ধর্মান্তরিত হওয়ার কয়েকটা কারণ থাকে। সেগুলোর মধ্যে অজ্ঞতা ও দারিদ্র্য অন্যতম। উত্তরবঙ্গে দেখা যায়, সেখানে দারিদ্র্য বেশি। সে কারণে প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন এনজিও তাদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করে।

গত ৪ মে ২০২৪ দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক কালবেলা “ধর্মান্তরকরণে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর নতুন মিশন!
বাড়ছে উদ্বেগ” প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।



আমাদের ফেসবুক পেইজ