বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২০, ০৫:২৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বিশ্ব বিখ‍্যাত শিল্পপতি অম্বরিশ সুখশান্তির খোঁজে সনাতন ধর্মগ্রহন করে হয়ে উঠলেন কৃষ্ণ ভক্ত মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষার্থে নতুন সিটি করপোরেশন প্রশাসকের নিকট মন্দির কমিটির খোলা চিঠি শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী পরিষদ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন অনাথ আশ্রমে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ লাখাইয়ে স্বাস্থ্য বিধি মেনে দুই দিন ব্যাপী শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব উৎসব পলিত হচ্ছে বন্যার পরেও কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে দিগন্তজুড়ে সবুজের সমারোহ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মায়ের বাড়ি শ্রীশ্রী শচীঅঙ্গন ধামে ডাকাতি শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সুজিত কুমার দাশ শুভ জন্মাষ্টমী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন শিক্ষা উপ-মন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ যশোরের ভার্চুয়্যাল আয়োজন শুভ জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন শ্রীকৃষ্ণ দুষ্টকে দমন করে সৃষ্টকে পালন করেছিলো

বীর ঈশা খাঁর স্মৃতিবিজড়িত গোপিনাথ জিউর আখড়া

গোপিনাথ জিউর আখড়া

প্রায় ৫০০ বছর আগে নির্মিত গোপীনাথ জিউর মন্দির বাংলার বার ভূঁইয়াদের অন্যতম বীর ঈশা খাঁর স্মৃতিবিজড়িত প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন। কটিয়াদী উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তর দিকে আচমিতা ভোগ বেতাল এলাকায় মন্দিরটি অবস্থিত। গোপীনাথ জিউর মন্দিরটিকে সংস্কার করা হলে, এটি হতে পারে এ অঞ্চলের নান্দনিক পর্যটন কেন্দ্র।

সুপ্রাচীন এই দেবালয়টি মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় নির্মাণ করেন। গোপীনাথ জিউর মন্দিরের দক্ষিণে অবস্থিত কুটামন দিঘিও রাজা নবরঙ্গ রায়ের স্মৃতিস্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় ৩০ একর আয়তনের বৃহৎ এই জলাশয়টি প্রাচীন এই মন্দিরের আকর্ষণ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

স্থাপত্য শিল্পের দিক দিয়ে গোপীনাথ জিউর মন্দিরটিতে ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের প্রাচীন মন্দিরের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। এই মন্দিরটি দেখার জন্য প্রতি বছর এখানে অসংখ্য পর্যটক ভীড় জমান।

গোপীনাথ জিউর মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে নানা জনশ্রুতি রয়েছে। কারও কারও মতে, রাজা নবরঙ্গ রায় স্বপ্নাদৃষ্ট হয়ে এই মন্দির নির্মাণের কাজে হাত দেন। আবার কারও কারও মতে, এই দেবালয়টির স্থানে একটি প্রাচীন বৃহৎ বটবৃক্ষের নিচে অবস্থানরত এক সাধক পাগল বাউলের নির্দেশে ধর্মানুরাগী রাজা নবরঙ্গ রায় এই দেবালয়টির নির্মাণ কাজ শুরু করেন। রাজা নবরঙ্গ রায় ওই সাধক পাগল বাউলের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন বলেও জানা যায়। তৎকালীন সময়ে রাজা নবরঙ্গ রায় এই দেবালয়টি নির্মাণ করার কাজে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন।

কিংবদন্তী রয়েছে, মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ হলে হঠাৎ এক বাউল পাগল আনন্দে আত্মহারা হয়ে মন্দিরের উত্তর পাশের একটি নিম্ন জলাভূমিতে ঝাঁপ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যান। এরপর ওই পাগল বাউলকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই কিংবদন্তীর কারণে মন্দিরের উত্তর দিকে মজে যাওয়া ওই জলাভূমিটি আজো এলাকায় বাউল সাগর নামে পরিচিত। বর্তমানে মন্দিরের জায়গার পরিমাণ ২৫ একর ৮ শতাংশ।

জনশ্রুতি রয়েছে, বাংলার বার ভুঁইয়ার অন্যতম ঈশা খাঁ তৎকালীন তার এগারসিন্দুর দূর্গ থেকে মন্দির সংলগ্ন এলাকা দিয়ে জঙ্গলবাড়ি যাওয়ার পথে মন্দিরের ভোগ আরতির সুঘ্রাণে যাত্রা বিরতি করেন। এ সময় তিনি মন্দিরটি উন্নয়নে অনেক জমি দান করেন। তার উৎসর্গীত অনুদানের নিদর্শনস্বরূপ পশ্চিম পাশের মন্দিরটিতে শ্বেত পাথরে খোদাই করা ফরাসি ভাষায় লিখিত একটি নামফলক ছিল। পরবর্তী সময়ে দুর্বৃত্তরা এটি চুরি করে নিয়ে যায়।

১৫৮৯ খ্রিস্টাব্দে মোঘল সম্রাট আকবর রাজা মানসিংহকে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করেন। এ সময় বাংলার বার ভূঁইয়ার অন্যতম মসনদে আলা ঈশা খাঁর স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণে সম্রাট আকবরের নির্দেশে রাজা মানসিংহ ঈশা খাঁর এগারসিন্দুর দূর্গ আক্রমণ করেন। এ যুদ্ধে মোঘল বাহিনীসহ রাজা মানসিংহ ঈশা খাঁর কাছে পরাজিত হন। ঈশা খাঁর এই যুদ্ধ জয়ের সবচেয়ে বড় বিজয় উল্লাস হয় গোপীনাথ জিউর রথের মেলায়।

রথযাত্রার মেলা উপলক্ষে এই মন্দিরে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক লোক সমাগম ঘটত। হাওর এলাকাগুলো থেকে আসত বড় বড় নৌকা ও বজড়ার বহর। অগণিত যাত্রীবাহী নৌকা ও বজড়ার মিছিল, অসংখ্য নৌকা ও বজড়ার দাঁড়ের কর কর, কল কল শব্দের সাথে পূণ্যার্থীদের কলরব আর নারীদের উলুধ্বনিতে নিভৃত পল্লীর এই সবুজ বনানী এক অবর্ণনীয় আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠত।

বর্তমানে মন্দিরের বিভিন্ন অট্টালিকা দিনদিন ভেঙ্গে যাচ্ছে। একটি জরাজীর্ণ ব্রিজ গোপীনাথ মন্দিরে প্রবেশ মুখে আছে যা পানাম নগরীর নকশার তৈরি। এছাড়া এখানে রয়েছে দোলমঞ্চ, আদি মন্দির, মূল মন্দির, ঝুলন মন্দির, গুণ্ডিচা মন্দির ও ৩টি বড় পুকুর।

গোপীনাথ জিউর মন্দিরে সর্বপ্রথম পূর্ব বঙ্গের সর্ববৃহৎ রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া মন্দিরটি ছিল বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য অন্যতম একটি তীর্থ স্থান। হিন্দু ধর্মীয় প্রায় সব আচার-অনুষ্ঠান এখানে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো। রথযাত্রা, দোল পূর্ণিমা, রাস পূর্ণিমা, ঝুলন যাত্রা, জন্মাষ্টমী, পৌষসংক্রান্তি ইত্যাদি অনুষ্ঠান উপলক্ষে এখানে জমতো বিরাট মেলা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আয়োজন ছিল রথযাত্রার মেলা। এক সময় ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের পুরীর জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার পরেই ছিল এর স্থান। এখনও প্রবাদ আছে, ‘পুরীর জগন্নাথ বঙ্গের গোপীনাথ’।কিন্তু আগেকার সেই জৌলুস না থাকলেও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐত্যিহ্যবাহী এই দেবালয়টি। হারিয়ে যাওয়ার পথে দেবালয়টি টিকিয়ে রাখার জন্য একটি ট্রাস্ট কমিটির মাধ্যমে মন্দিরটি পরিচালনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রাচীন এই মন্দিরটি হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন।

এলাকার মুসলমানরা গোপীনাথ জিউর মন্দির ও মন্দিরের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণে ভূমিকা রেখে চলেছেন। যদিও সরকারের রাজস্ব বিভাগের কতিপয় অসৎ কর্মচারীদের মাধ্যমে বেশ কিছু জমি বেহাত হয়েছে। এরপরও প্রাচীন এই মন্দিরটির সংস্কার করা হলে এর সৌন্দর্য আরও বাড়বে। আর এর মাধ্যমে এটিকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সহজেই গড়ে তোলা যাবে।

সূত্রঃ কিশোরগঞ্জ নিউজ।

 



আমাদের ফেসবুক পেইজ