শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ০১:৫৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
এমপির বিরুদ্ধে পত্রিকায় প্রতিবেদনে প্রকাশকের ঘরবাড়ী,পত্রিকা অফিস সহ হিন্দুদের বাসা-বাড়ি ভাঙচুর ধামরাই ইসলামপুর বহুমুখী মৎস্য আড়তদার সমিতির সাবেক সাঃ সম্পাদক নারায়ণ রাজবংশীর পরলোকগমন চুক্তির বাকি ভ্যাকসিন দ্রুত পেয়ে যাবে বাংলাদেশ: দোরাইস্বামী জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের হামলার হুমকি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ৮৩ কেজি ওজনের কষ্টি পাথরের বিষ্ণুমূর্তি উদ্ধার ইসলাম না মানলে ছাড়তে হবে দেশ ! বাংলাদেশে মৌলবাদীদের হুমকির শিকার হিন্দু পরিবার ঠাকুরগাঁওয়ে ৩০ কেজি ওজনের বিষ্ণুমূর্তি উদ্ধার সাতক্ষীরা হিন্দু নাবালিকা ছাত্রী অপহরণকারী প্রধান শিক্ষক শামীম আহমেদ গ্রেফতার বিচার দেওয়ায় হিন্দু পরিবারের উপর সশস্ত্র হামলা সুনামগঞ্জে হিন্দু পরিবারের ওপর হামলা যুবক বৃদ্ধ,নারীসহ আহত ৮

ভয়ে এখনো ঘরে ফেরেনি শাল্লা নোয়াগাঁওয়ের সংখ্যালঘু পরিবারগুলো

Spread the love

 

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে কটূক্তির অভিযোগে বুধবার সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়িঘরে হামলা চালায় মামুনুল হকের সমর্থকরা। গ্রামের পাঁচটি মন্দির ও শতাধিক বাড়িতে লুটপাট চালানো হয়। ওই ঘটনার পর থেকে আতঙ্ক কাটছে না গ্রামবাসীর মধ্যে। গ্রামের নারী ও শিশুরা ভয়ে বাড়ি ফেরেনি এখনও।

এরআগে নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে ওই কটূক্তির অভিযোগ ওঠে।

হামলার বিষয়ে অভিযুক্ত ঝুমনের মা নিভা রানী দাস বলেন, ‘গাঁওয়ের হকলে (সবাই) যখন আইয়া দোষারোপ করা শুরু করছইন, আমার চোখে পানি আসে। ছেলেটি এসে আমার হাত ধইরা কয়, ‘মা বিশ্বাস করো আমি ইতা করছি না। কেমনে অইছে আমি জানি না।’ নিভা রানী বলেন, ‘ছেলেকে কইছি, তোর জন্য এখন হকল বিপদে পড়ছে। ছেলে আমার মুখের দিকে তাকাইয়া হাত ছাইরা চলে গেছে। জানি না আমার ছেলে ইটা করছে কী-না। আমার ছেলে কইরা থাকলেও গাঁওয়ের হকলের বাড়িত তারা হামলা করলো কেনে? অখন হকলে (সবাই) আমরারে দোষারোপ কররা।’

তিনি আরও বলেন, ছেলে অপরাধ করলে সে যেন শাস্তি পায়, এটি তিনিও চান। কিন্তু যারা নিরীহ গ্রামবাসীর বাড়ি-ঘর লুটপাট করেছে, মন্দির, দেবতা ভাঙচুর করেছে, তারাও যেন শাস্তি পায়। এ সময় তার চোখের পানি ঝড়তে ঝড়তে থাকে।

ঝুমনের বোন মনিকা রানী দাস বলেন, ‘আমার ভাইতো পুলিশের হেফাজতে, কিন্ত তার আইডি এখনো সচল, এটা কী করে হয়। কীভাবে এসব হচ্ছে বুঝতেই পারছি না।’

ঝুমনের স্ত্রী সুইটি রানী দাস জানান, হামলার সময় তিনি ঝাপির (ধান রাখার পাত্র) নীচে লুকিয়েছিলেন। বাড়ি তছনছ করে ফেরার সময় হামলাকারীদের একজন তার শাড়ির আঁচলের একটি অংশ দেখে তাকে চুলে ধরে ঘাড়ে রোল দিয়ে আঘাত করে। এসময় হাত জোড় করে সুইটি মাপ চান। হামলাকারীদের একজন বলে ওঠেন, ‘ও ঝুমনের বউ, ওরে মাপ করা যাবে না।’ আরও দুইজন বলে, ‘কানের স্বর্ণের দুল গলার চেইন খুলে দে। ঘরে টাকা থাকলে তাড়াতাড়ি বের করে নিয়ে আয়।’ গলার চেইন, কানের দুল এবং আমার শাশুড়ির সামান্য টাকা সঙ্গে সঙ্গেই তাদের হাতে দেবার পর তারা চলে যায়।

স্থানীয়রা জানায়, বুধবার সকাল ৮টায় দা, রামদা, ছুরি, লাটিসোটা নিয়ে গ্রামের দিকে যখন শতশত মানুষ স্লোগান দিয়ে আসছিলো, তখন গ্রাম ছেড়ে হাওরের দিকে দৌঁড়াতে শুরু করে সবাই। নারী শিশুসহ হাওরের ওপারের গ্রামগুলোতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে পুরুষদের কেউ কেউ বিকালেই বাড়ি ফেরেন, বয়স্ক নারীরাও বাড়ি আসেন। কিন্তু ভয়ে আতঙ্কে গ্রামের মেয়ে ও শিশুদের বাড়িতে ফিরিয়ে আনেননি অনেকে। দূরে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আছেন তারা।

গ্রামের ষাটোর্ধ্ব ভানু রঞ্জন দাস বলেন, ‘মেয়ে সুপ্রিয়া রানী দাস (১৬) হাওরের ধানক্ষেত দিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে মামার বাড়ি গিয়ে ওঠেছে। সে ভয়ে বাড়ি আসতে চাচ্ছে না। আমিও সাহস পাচ্ছি না তাকে আনতে। কীভাবে আনি, যারা এসে হামলা করেছে তাদের সঙ্গে মিলে মিশে কয়েক পুরুষের জীবন এখানেই কেটেছে। তারা এভাবে এসে হামলা করতে পারে- চিন্তা করতেও কষ্ট হয়। এখন মেয়েকে বাড়ি আনতে সাহসই পাচ্ছি না।’

একই ধরনের মন্তব্য করেন, রনধীর দাস (৪০)। তিনি বললেন, মেয়ে আইভী (১৪) ও ছেলে শুভকে (৯) বাড়ি আনেননি। ওরাও আসতে চাইছে না। উল্টো আমরা যেন তাদের কাছে চলে যাই, সেজন্য কান্নাকাটি করছে। মেয়েটি বলছে, ‘যেভাবে বড় বড় রামদা নিয়ে এসেছিল। আমরা আর বাড়ি যাব না।’

গ্রামের সীমা রানী তালুকদার ও প্রসেন দাস ২ শিশুকন্যা নিয়ে দৌঁড়ে হাওর পারি দিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত বাড়ি আসেননি তারা। তিনি বলেন, ‘দুপুর ১২টায় গ্রামে র‌্যাব ও পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে খবর পেয়ে বাড়ি ফিরেছি। এসে দেখি ঘরের ভেতরে সব কিছু ভেঙে তছনচ করা হয়েছে। চালের ড্রাম থেকে চাল নিয়ে বাইরে ফেলা হয়েছে। শোকেস ভেঙে স্বর্ণালংকার টাকা পয়সা সব নিয়ে গেছে।’

মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার নেই: পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বৃহস্পতিবার বিকাল ৬টায় জানান, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। তবে হামলাকারীরা গা ডাকা দিয়েছে। আইননুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে। বাদী ও আসামিদের বিষয়ে তথ্য আপাতত দিতে অপারগতা জানান তিনি। শাল্লা থানার ওসি নাজমুল হক জানান, পুলিশ বাদী হয়ে একটি এবং গ্রামবাসীর পক্ষে আরেকটি মামলা দায়ের হয়েছে।

হামলাকারীদের বিরুদ্ধে র‌্যাবের হুঁশিয়ারি: বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ্ আল মামুনসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নোয়াগাঁওয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি ঘুরে দেখেন। এসময় র‌্যাব প্রধান বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের কালো হাত ভেঙে দেওয়া হবে। আজকের মধ্যেই মামলা হবে। অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াবে সরকার। তিনি বলেন, গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। আজ থেকে র‌্যাব ক্যাম্প হবে।

গ্রামবাসীকে ভয় না পাবার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার আপনাদের পাশে আছে। এই দেশ হিন্দু-মুসলিমসহ সকলের। এই চিন্তা করেই সরকার কাজ করছে এবং এজন্যই দেশের অগ্রগতি হচ্ছে, ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, মাওলানা মামুনুল হকের সমর্থকরা বুধবার নোয়াগাঁও গ্রামের ৮৮টি বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর চালিয়েছে। এসময় গ্রামের ৫টি মন্দির ভাঙচুর করা হয়। নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে মাওলানা মামনুল হককে কটাক্ষ করে কথিত স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়ায় বুধবার সকাল ৮ টা থেকে ১০ টার মধ্যে এই তাণ্ডব চালানো হয়।

 

তথ্য সূত্রঃ সমকাল
 
 



আমাদের ফেসবুক পেইজ